গুলশান-২, ঢাকা, বাংলাদেশ   Thursday,20 June 2024

শিউলি’র পরিবর্তনের গল্প

about1

কায়সার আলী সৈকত


লতানা ইসলাম শিউলি নাগরপুর ইউনিয়নের কাশদহ গ্রামের মো. জামাল উদ্দিন মামুন এর সহধর্মিনী। স্বামী, ২ কন্যা, ননদ এবং শাশুড়িসহ ৬ সদস্যের পরিবার। তার স্বামী ছিলেন ভাড়ায় চালিত একজন অটোরিক্সা চালক যার দরুন সারাদিনের আয়ের বেশিরভাগ অটোরিক্সার মালিককে দিয়ে দিতে হতো। এতে সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকতোÑ ফলে সংসার পরিচালনা করা বড়ই কষ্টসাধ্য ছিল। সংসারের এই অবস্থা দেখে শিউলি বেগম উপলব্ধি করেন স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে সংসারটা সচ্ছল করে তুলবেন। এরপর তিনি স্বামীর সাথে আলোচনা করে তার গহনা বিক্রির টাকা এবং তার বাবার কাছ থেকে কিছু টাকা এনে তার স্বামীকে ১টি অটোরিক্সা কিনে দেন এবং বুরো বাংলাদেশ এর নিকট থেকে ঋণ গ্রহণ করে তার বাড়ির সামনেই একটি মুদি দোকান দেন এবং ক্ষুদ্র পরিসরে ব্যবসা শুরু করেন, পাশাপাশি গবাদি পশু ও মুরগি পালন করেনÑ এভাবে তিনি তার সংসারকে সচ্ছলতার সাথে পরিচালনা করে আসছেন। গত জুন মাসে বুরো বাংলাদেশ এর নাগরপুর-২ শাখা থেকে তাকে সমাজের মানুষের স্বাস্থ্যগত বিষয়ে সচেতন করার জন্য কাজ করার কথা বলা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় সমাজে তার আরো একটি পরিচয় প্রকাশ পায় সেটি হলো, তিনি বুরো বাংলাদেশের ‘মৌলিক স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মসূচি’ প্রকল্পের একজন কো-হেলথ এডুকেটর।
গত ১৯ অক্টোবর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত মৌলিক স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মসূচি থেকে তিনি মোট ৪ দিনের প্রশিক্ষণ পান। এই প্রশিক্ষণ থেকে তিনি অনেক বিষয় সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন যেমন- মাতৃত্বকালীন সেবা ও নবজাতকের যত্ন, সুষম খাবার, কিশোর-কিশোরী স্বাস্থ্য, হাত ধোয়া, যৌন রোগ ও সেবা, নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা, কোভিড-১৯সহ নানা বিষয়। প্রশিক্ষণ শেষে তার যে উপলব্ধি হয়েছে তা হলো দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করা, পারিবারিক ও সামাজিক কুসংস্কার এবং অল্প শিক্ষার কারণে এতদিন কত অসচেতন এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেই না তারা বসবাস করতেন। এই প্রশিক্ষণ শেষে এখন তিনি তার এলাকার ২০০টি পরিবারের প্রায় ৯০০ জন মানুষের মাঝে প্রশিক্ষণের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সচেতন করে তুলেছেন। 
খোলা পায়খানা অপসারণ করে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা তৈরির গল্প: অভাব-অনটনের সংসারে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস কি সেটা জানতেন না আর গ্রামের নারী হিসেবে স্বামী যেভাবে রাখতেন সেভাবেই থাকতেন। তাদের পায়খানা বলতে বাড়ির পাশে পুকুরের কিনারায় গর্ত করা এবং পুরনো শাড়ি দিয়ে বেড়া দেওয়া এবং মল সরাসরি পুকুরে চলে যেত, এছাড়া যথেষ্ট পানি ব্যবহারেরও ব্যবস্থা থাকতো না বা পায়খানার পর সাবান পানি দিয়ে হাত ধুতে হয় জানলেও ব্যবস্থা ছিল না। বর্ষা মৌসুমে পুকুরের পানি ভর্তি হয়ে পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়তো ফলে বর্ষা মৌসুমে রোগবালাই বেশি হতো। এছাড়া বাড়ির কিশোরী মেয়ে ও নারী সদস্যরা মাসিকের সময় অনেক সমস্যায় পড়তেন কিন্তু তার পরিবারের মানুষজন এ বিষয়টাতে তেমন গুরুত্ব দিতেন না। বুরো বাংলাদেশের ‘মৌলিক স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মসূচি’ প্রকল্পের প্রশিক্ষণ চলাকালীন স্বাস্থ্যকর পায়খানা নিয়ে সেশন নেওয়ার সময় অস্বাস্থ্যকর বা খোলা পায়খানা ব্যবহারের খারাপ দিকগুলো তুলে ধরেন তখন তিনি বাড়িতে এসে তার স্বামীর সাথে আলোচনা করেন এবং পাকা পায়খানা তৈরির পরিকল্পনা করেন। ঘরে থাকা কিছু সঞ্চয় এবং বুরো বাংলাদেশের সমিতিতে জমানো সঞ্চয়ের টাকা উত্তোলন করে পাকা স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা তৈরি করেন। এই পায়খানা তৈরির ফলে তার কিশোরী মেয়ে খুব খুশি।
বুরো বাংলাদেশের ‘মৌলিক স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মসূচি’ প্রকল্পের একজন কো-হেলথ এডুকেটর হিসেবে তিনি কি কাজ করেন তা তার পরিবার ও সমাজের মানুষ বুঝতে পেরেছেন যার ফলে পরিবারের সকলের কাছে তিনি আস্থা ও বিশ^াসের পাত্রী হয়েছেন এবং পারিবারিক বিভিন্ন কাজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখন তার মতামত নেওয়া হয় এতে তিনি মনে করেন একজন নারী হিসেবে তার পারিবারিক সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতি সপ্তাহে ২০০টি পরিবারের কাছে স্বাস্থ্য শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার কাজ করতে গিয়ে সকলের সম্মান ও ভালোবাসা পাচ্ছেন এবং এলাকায় তার আলাদা পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন তিনি রান্না করার সময় দেখেন পরিবারের সকলের জন্য সুষম খাবার নিশ্চিত হচ্ছে কি না, ঘরের ও আঙ্গিনার ময়লা-আবর্জনা নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলা হচ্ছে কি না তার কিশোরী মেয়েকে কিশোরীকালীন স্বাস্থ্য নিয়ে সাহস ও সচেতন করেন ফলে তাদের পরিবারের সকলের মাঝে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে উঠেছে।
বুরো বাংলাদেশের ‘মৌলিক স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মসূচি’ প্রকল্পের প্রশিক্ষণ পেয়ে তিনি অনেক আত্মবিশ^াসী হয়েছেন এবং প্রকল্প এর সাথে যুক্ত হতে পেরে তিনি সকলের কাছে অনেক কৃতজ্ঞ।

 

হেলথ ট্রেইনার, মৌলিক স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মসূচি
বুরো বাংলাদেশ